Avatar মোঃ আব্দুর রাকিব

আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ নয়, আমরা কি জানি?

এপস্টিন ফাইল প্রকাশ পাওয়ার পর সারা বিশ্ব যখন আমেরিকার নৈতিক অধঃপতন নিয়ে তোলপাড় করছিলো, তখন বাংলাদেশেও অনেকে সরব হয়েছিলেন। ছি ছি করেছিলেন। আমেরিকা কত খারাপ, পশ্চিমা সভ্যতা কত অশ্লীল, এই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেদের দিকে একবারও তাকিয়েছি?

অনুসন্ধানী সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ইমরান এপস্টিন ফাইল প্রকাশেরও কয়েক বছর আগে ফেসবুকে প্রায় আট থেকে দশটি বাংলাদেশি গ্রুপের নাম প্রকাশ করেছিলেন। সেই গ্রুপগুলোতে নারী ও শিশুদের ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করে যৌন ফ্যান্টাসি প্রকাশ করা হতো। এই ছবিগুলো কোনো হোটেলের গোপন ক্যামেরায় তোলা ছিলো না। এগুলো ছিলো একদম ঘরের ভেতরের স্বাভাবিক মুহূর্তের ছবি। একজন মা বুকের দুধ পান করাচ্ছেন শিশুকে। একজন নারী বাথরুমে কাপড় কাচছেন। একজন মেয়ে নিজের বেডরুমে ঘুমাচ্ছেন। কেউ রান্নাঘরে রান্না করছেন। কেউ রাস্তায় হাঁটছেন, বাজার করছেন, স্কুলমাঠে খেলছেন।

এই ছবিগুলো তুলেছে কে? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নারী কার সামনে বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করান? কার সামনে বেডরুমে ঘুমান? কার সামনে বাথরুমে কাপড় কাচেন? নিশ্চিতভাবেই তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষের সামনে। তার স্বামী, বাবা, ভাই, বোন, বা পরিবারের কোনো নিকটজন। অর্থাৎ যে মানুষটা সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিশ্বাস করা হতো, সে-ই এই ছবিগুলো তুলে অনলাইনের অসংখ্য অন্ধকার ফেসবুক টেলিগ্রাম সহ নানান অশ্লীল গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতকতার এই গভীরতা বোঝানোর ভাষা নেই।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে ঘটনার কথা উঠে এসেছে, সেটি হলো আড়াই থেকে তিন বছরের একটি শিশু কন্যার গোপনাঙ্গ স্পর্শ করার ছবি। একটি শিশু যে বোঝেই না তার সঙ্গে কী হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের সমাজের ভেতরে বিদ্যমান। এটা কোনো পশ্চিমা সমস্যা নয়। এটা আমাদের নিজেদের সমস্যা।

বাংলাদেশে শিশু যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান ভয়াবহ। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, এবং বিশেষজ্ঞরা বলেন বাস্তব সংখ্যা এর বহুগুণ বেশি, কারণ অধিকাংশ ঘটনা পরিবারের ভেতরে চাপা পড়ে যায়। UNICEF-এর গবেষণা বলছে, শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী শিশুটির পরিচিত ও বিশ্বস্ত কেউ।

এবার একটু থামুন এবং ভাবুন।

যেসব ভাই মনে করছেন এটা শুধু মেয়েদের সমস্যা, তারা কিছু তথ্য জানুন। বাংলাদেশে এরকম বহু গ্রুপ আছে যেখানে পুরুষ ও ছেলে শিশুদের অপ্রস্তুত ছবি নিয়েও একইভাবে ফ্যান্টাসি তৈরি হয়। কাকে কোথায় কীভাবে নিপীড়ন করা যায় সেই পরিকল্পনা সম্মিলিতভাবে আলোচনা হয়। কদিন আগেও এমন একটি গ্রুপ ভাইরাল হয়েছিলো যেখানে বারো বছরের কম বয়সী শিশুদের ছবি আপলোড করা হয়েছিলো। এই শিশুগুলো ছেলে ও মেয়ে উভয়ই।

এখন প্রশ্ন করুন নিজেকে। এখনো কি মনে হচ্ছে আপনার ছেলে নিরাপদ?

পরিচিত ছেলেদের মধ্যে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে তারা শৈশবে কোনো যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে কি না, তাহলে দেখা যাবে প্রায় সবাই কোনো না কোনো রূপে নিপীড়িত হয়েছে। এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই সেই নিপীড়ক ছিলো পরিচিত কোনো পুরুষ। এই তথ্য কেউ মুখে বলে না। লজ্জায় চুপ থাকে। সমাজ ভুলতে বলে। কিন্তু ক্ষত থেকে যায় সারা জীবন।

এখন আসি সবচেয়ে ভয়াবহ একটি প্রসঙ্গে। ঘরের বাইরে, পথেঘাটে, বাজারে যে বিপদ আছে সেটা আমরা কিছুটা হলেও বুঝি। কিন্তু যে জায়গাটাকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? স্কুল? মাদ্রাসা? সেখানে কী হচ্ছে?

কিছুদিন পরপরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, কোনো মাদ্রাসায় হুজুর ছাত্রকে নিপীড়ন করেছে। কোনো স্কুলে শিক্ষক ছাত্রীর সাথে অশ্লীল আচরণ করেছে। এই ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে, কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। কারণ একটাই। অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না। একজন শিশু নির্যাতনকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, কিন্তু বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। পরিবার নীরব থাকতে বাধ্য হয় সামাজিক চাপে। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়। এবং একদিন একই স্কুলে বা মাদ্রাসায় সে আবার শিক্ষকের চেয়ারে বসে।

এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আজ সবচেয়ে বড় বিপদ।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, একজন বাবা বা মা হিসেবে আপনি কি নিশ্চিন্তে আপনার সন্তানকে স্কুলে বা মাদ্রাসায় পাঠাতে পারছেন? আগামীকাল আপনার সন্তান যৌন নিগ্রহের শিকার হবে না, এই লিখিত নিশ্চয়তা কি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আপনাকে দিতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে কীভাবে আপনি নিশ্চিন্তে সন্তানকে পাঠাবেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন শুধু পড়ানোর দায়িত্ব নয়, প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার দায়িত্বও নিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি থাকতে হবে। নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ হতে হবে। যেকোনো অভিযোগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে।

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে হয়, আমাদের দ্বীন শুরু থেকেই শিশুর নিরাপত্তা, নারীর সম্মান ও পারিবারিক বিশ্বাসের সুরক্ষার কথা বলেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। এই নির্দেশনা কেবল আখিরাতের কথা বলে না, এই দুনিয়াতেও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার কথা বলে। যে ব্যক্তি নিজের পরিবারের মহিলাদের বা শিশুদের ছবি কুৎসিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, সে কেবল শরিয়ার লঙ্ঘন করে না, সে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে। আমানতের খেয়ানত করে, যা ইসলামে মুনাফিকির সবচেয়ে বড় আলামত।

আজকের এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং তা গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করা কেবল আত্মিক দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের সন্তানদের সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। যে পরিবারে আল্লাহর ভয় আছে, যেখানে হারাম-হালালের বোধ আছে, সেই পরিবারে এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনা অনেক কম। আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ইসলামের আদব, লজ্জাশীলতা, এবং সীমা মেনে চলার শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি কেউ অসদাচরণ করলে চুপ না থেকে বলার সাহস দিতে হবে।

রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে হয়, বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী এই ধরনের কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধ এবং কঠোর শাস্তিযোগ্য। কিন্তু আইন থাকলেই হয় না, যদি না সচেতনতা থাকে, যদি না আমরা রিপোর্ট করি, যদি না আমরা মুখ খুলি। এই অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে।

আপনার জানামতে যদি কোনো মাদ্রাসায়, স্কুলে বা অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশু যৌন নিগ্রহ, বলাৎকার বা ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে চুপ থাকবেন না। আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাধ্যমতো আইনি সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি সরকারি আইনি সহায়তার জন্য নিচের নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করুন।

জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯। মহিলা ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল হেল্পলাইন: ১০৯। বাংলাদেশ জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা (NLASO): ১৬৪৩০। শিশু হেল্পলাইন: ১০৯৮।

আমরা সবাই জানি এই সমাজের তথাকথিত সুশীল ও সেকুলার শ্রেণি এই বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। এপস্টিন নিয়ে পশ্চিমকে গালি দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের ঘরের ভেতরে, নিজের স্কুলে, নিজের মাদ্রাসায় কী হচ্ছে সেটা নিয়ে কথা বলার সাহস নেই। এই নীরবতা কি তাহলে সম্মতি?

আপনি যখন ভুক্তভোগী, যখন আপনার সন্তান ভুক্তভোগী, তখন সব পার্থক্য মিলিয়ে যায়। তখন ধর্ম, রাজনীতি, মতাদর্শ কিছুই থাকে না। তখন শুধু একটাই পরিচয় থাকে, আমরা মানুষ। এবং আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ নয়।

তাই আজকে একটাই অনুরোধ। একটু সংবেদনশীল হই। সতর্ক হই। মুখ খুলি। শিশুদের কথা বলতে শেখাই। কোনো স্পর্শ অস্বস্তিকর মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মাকে বলার সাহস দিই। বিশ্বাসের মানুষকেও অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি এবং সন্তানকেও সেই শিক্ষায় গড়ে তুলি। কারণ আমি, আপনি, আমরা কেউই নিরাপদ নই। এবং সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ নয়। এখনই সময় জেগে ওঠার।

উস্তাদ সুলতান নাঈম
শিক্ষক, লেখক, আলোচক, পরামর্শক
২৬ এপ্রিল ২০২৬
+8801682981828
(ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ)

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: আত্মহত্যাপ্রবণতা এবং ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষদের মোটিভেশন এবং কাউন্সেলিং, দেশে এবং প্রবাসে বিবাহের জন্য সকল প্রকার পাত্র-পাত্রী, এবং ইসলামি শরিয়াসম্মত কোরআনি রুকইয়া চিকিৎসার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।)

#শিশুসুরক্ষা #ChildSafety #অনলাইননিরাপত্তা #বাংলাদেশ #সচেতনতা #ChildAbuse #DigitalSafety #নারীনিরাপত্তা #সামাজিকসচেতনতা #শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান #বিচারহীনতা #উস্তাদসুলতাননাঈম

Post Image Apr 26, 2026, 10:28 pm · 94 Views · Public
Like (11) - Comment - Share - More

Leave a Comment

Login to leave a comment.

Comments

Total Comments: 1

Avatar

Bellal Hasan: Dhndn

May 1, 10:53 pm - [Report]